Post

শীর্ষ ২% বিজ্ঞানী কীভাবে নির্ধারণ করা হয়: একটি বিস্তারিত গাইড

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ ২% বিজ্ঞানীদের তালিকা কীভাবে তৈরি করা হয় এবং কোন মেট্রিক্স ব্যবহার করা হয় তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা

শীর্ষ ২% বিজ্ঞানী কীভাবে নির্ধারণ করা হয়: একটি বিস্তারিত গাইড

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় প্রতি বছর বিশ্বের শীর্ষ ২% বিজ্ঞানীদের একটি তালিকা প্রকাশ করে। এই তালিকায় স্থান পাওয়া একজন গবেষকের জন্য অত্যন্ত সম্মানের বিষয়। কিন্তু এই তালিকা কীভাবে তৈরি করা হয়? কোন মাপকাঠি ব্যবহার করা হয়? আসুন বিস্তারিতভাবে জেনে নেই।


শীর্ষ ২% বিজ্ঞানী তালিকা কী?

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদল, জন ইওয়ানিডিস (John Ioannidis) এর নেতৃত্বে, Scopus ডাটাবেস ব্যবহার করে বিশ্বব্যাপী গবেষকদের প্রভাব পরিমাপ করে এই তালিকা তৈরি করেন।

এই তালিকা দুই ধরনের:

  1. ক্যারিয়ার-লং ইমপ্যাক্ট (Career-long Impact): গবেষকের সম্পূর্ণ ক্যারিয়ারের উপর ভিত্তি করে
  2. একক বছরের ইমপ্যাক্ট (Single Year Impact): নির্দিষ্ট একটি বছরের প্রকাশনার উপর ভিত্তি করে

কোন মেট্রিক্স ব্যবহার করা হয়?

শীর্ষ ২% বিজ্ঞানী নির্ধারণে নিম্নলিখিত মেট্রিক্স ব্যবহার করা হয়:

১. সাইটেশন মেট্রিক্স (Citation Metrics)

মেট্রিক্সবর্ণনা
মোট সাইটেশনগবেষকের সকল প্রকাশনায় প্রাপ্ত মোট সাইটেশন সংখ্যা
h-indexগবেষকের h সংখ্যক পেপার যেখানে প্রতিটি অন্তত h বার উদ্ধৃত হয়েছে
hm-indexCo-author সংখ্যা বিবেচনা করে সংশোধিত h-index

২. কম্পোজিট স্কোর (Composite Score)

একটি সম্মিলিত স্কোর (composite score) তৈরি করা হয় যা নিম্নলিখিত বিষয়গুলো বিবেচনা করে:

  • সাইটেশনের সংখ্যা
  • h-index এবং hm-index
  • Co-authorship এর প্রভাব
  • Self-citation বাদ দেওয়া
  • প্রকাশনার ক্ষেত্র (Field of Research)

৩. ফিল্ড-নরমালাইজড মেট্রিক্স

বিভিন্ন গবেষণা ক্ষেত্রে সাইটেশনের প্রবণতা ভিন্ন হওয়ায়, ফিল্ড-নরমালাইজড পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। উদাহরণস্বরূপ:

  • জীববিজ্ঞান/চিকিৎসা: সাধারণত বেশি সাইটেশন পায়
  • গণিত/পদার্থবিজ্ঞান: তুলনামূলকভাবে কম সাইটেশন পায়

এই পার্থক্য সমন্বয় করার জন্য প্রতিটি ক্ষেত্রের জন্য আলাদা মান নির্ধারণ করা হয়।


গণনা পদ্ধতি (Calculation Methodology)

ধাপ ১: ডাটা সংগ্রহ

  • ডাটা উৎস: Scopus ডাটাবেস
  • সময়কাল: 1996 থেকে বর্তমান
  • তথ্য: প্রকাশনা, সাইটেশন, co-authors, গবেষণা ক্ষেত্র

ধাপ ২: Self-Citation সরানো

গবেষকের নিজের দ্বারা করা সাইটেশন (self-citation) বাদ দেওয়া হয় যাতে প্রকৃত প্রভাব পরিমাপ করা যায়।

ধাপ ৩: Co-authorship সমন্বয়

যদি কোনো পেপারে অনেক co-author থাকে, তাহলে প্রতিটি লেখকের অবদান অনুযায়ী ক্রেডিট ভাগ করা হয়।

উদাহরণ:

  • যদি একটি পেপারে ৫ জন লেখক থাকে এবং পেপারটি ১০০ বার উদ্ধৃত হয়:
    • প্রথম লেখক: বেশি ক্রেডিট
    • মধ্যম লেখকরা: কম ক্রেডিট
    • শেষ লেখক (সাধারণত সিনিয়র লেখক): বেশি ক্রেডিট

ধাপ ৪: Composite Score গণনা

নিম্নলিখিত সূত্র ব্যবহার করে composite score হিসাব করা হয়:

1
Composite Score = (C / 5) + H + (Hm × 2) + (Ncs / Nps) + (Ncsf / Nps)

যেখানে:

  • C: মোট সাইটেশন (self-citation বাদে)
  • H: h-index
  • Hm: hm-index (co-authorship adjusted)
  • Ncs: Single-authored পেপারের সাইটেশন
  • Ncsf: Single + first-authored পেপারের সাইটেশন
  • Nps: মোট পেপার সংখ্যা

ধাপ ৫: র‍্যাঙ্কিং এবং শীর্ষ ২% নির্বাচন

  • সকল গবেষকদের composite score এর ভিত্তিতে সাজানো হয়
  • প্রতিটি গবেষণা ক্ষেত্রে (22টি প্রধান ক্ষেত্র এবং 176টি উপ-ক্ষেত্র) আলাদাভাবে র‍্যাঙ্কিং করা হয়
  • শীর্ষ ২% গবেষক নির্বাচন করা হয়

দুই ধরনের তালিকার পার্থক্য

১. ক্যারিয়ার-লং ইমপ্যাক্ট (Career-long Impact)

  • সময়কাল: 1996 থেকে বর্তমান পর্যন্ত
  • উদ্দেশ্য: গবেষকের সম্পূর্ণ ক্যারিয়ারের প্রভাব মূল্যায়ন
  • কারা এতে স্থান পায়: দীর্ঘ সময় ধরে ধারাবাহিক অবদান রেখেছেন এমন গবেষকরা

২. একক বছরের ইমপ্যাক্ট (Single Year Impact)

  • সময়কাল: শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট বছর (যেমন: 2023)
  • উদ্দেশ্য: সাম্প্রতিক গবেষণার প্রভাব মূল্যায়ন
  • কারা এতে স্থান পায়: সাম্প্রতিক উচ্চ-প্রভাবশালী গবেষণা প্রকাশ করেছেন এমন গবেষকরা

কেন এই তালিকা গুরুত্বপূর্ণ?

১. আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি

এই তালিকায় স্থান পাওয়া মানে:

  • বিশ্বমানের গবেষণার স্বীকৃতি
  • আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সুযোগ বৃদ্ধি
  • গবেষণা তহবিল পাওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি

২. প্রাতিষ্ঠানিক র‍্যাঙ্কিং

বিশ্ববিদ্যালয় এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জন্য:

  • প্রতিষ্ঠানের সুনাম বৃদ্ধি
  • বিশ্ব র‍্যাঙ্কিংয়ে উন্নতি
  • মেধাবী শিক্ষার্থী এবং গবেষক আকর্ষণ

৩. ক্যারিয়ার অগ্রগতি

ব্যক্তিগত পর্যায়ে:

  • প্রমোশন এবং টেনিউরের জন্য সহায়ক
  • পুরস্কার এবং ফেলোশিপ পাওয়ার সম্ভাবনা
  • বিশেষজ্ঞ হিসেবে স্বীকৃতি

বাংলাদেশী বিজ্ঞানীদের অবস্থান

বাংলাদেশী বিজ্ঞানীরাও এই তালিকায় স্থান পাচ্ছেন। তাদের সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা দেশের গবেষণার মান উন্নয়নের ইঙ্গিত দেয়।

চ্যালেঞ্জসমূহ

  1. সীমিত রিসোর্স: গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত তহবিল এবং অবকাঠামোর অভাব
  2. আন্তর্জাতিক সহযোগিতা: কম আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কিং সুযোগ
  3. প্রকাশনা খরচ: উচ্চ-মানের জার্নালে প্রকাশনা ব্যয়বহুল

সুযোগসমূহ

  1. ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম: অনলাইন সহযোগিতার মাধ্যমে বাধা কমছে
  2. ওপেন এক্সেস: বিনামূল্যে জ্ঞান শেয়ারিং বৃদ্ধি পাচ্ছে
  3. সরকারি উদ্যোগ: গবেষণায় সরকারি বিনিয়োগ বাড়ছে

কীভাবে শীর্ষ ২% এ পৌঁছানো সম্ভব?

১. মানসম্পন্ন গবেষণা

  • নভেল রিসার্চ: নতুন এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর খুঁজুন
  • পদ্ধতিগত কঠোরতা: শক্তিশালী গবেষণা পদ্ধতি ব্যবহার করুন
  • প্রভাবশালী জার্নাল: উচ্চ-ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর জার্নালে প্রকাশ করুন

২. ধারাবাহিক প্রকাশনা

  • নিয়মিত প্রকাশ: বছরে ৩-৫টি মানসম্পন্ন পেপার
  • দীর্ঘমেয়াদী প্রচেষ্টা: ১০-১৫ বছরের ধারাবাহিক কাজ

৩. আন্তর্জাতিক সহযোগিতা

  • কো-অথরশিপ: বিশ্বমানের গবেষকদের সাথে কাজ করুন
  • নেটওয়ার্কিং: আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে অংশগ্রহণ করুন

৪. গবেষণা প্রচার

  • সোশ্যাল মিডিয়া: ResearchGate, Twitter, LinkedIn ব্যবহার করুন
  • প্রেজেন্টেশন: কনফারেন্সে আপনার কাজ উপস্থাপন করুন
  • ওপেন এক্সেস: যথাসম্ভব ওপেন এক্সেসে প্রকাশ করুন

৫. Strategic Focus

  • নিশ এরিয়া: একটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ হন
  • ট্রেন্ডিং টপিক: সাম্প্রতিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কাজ করুন

সাধারণ ভুল ধারণা

ভুল ধারণা ১: “শুধু সাইটেশন সংখ্যা গুরুত্বপূর্ণ”

বাস্তবতা: Composite score অনেকগুলো ফ্যাক্টর বিবেচনা করে, শুধু সাইটেশন নয়।

ভুল ধারণা ২: “Self-citation দিয়ে র‍্যাঙ্কিং বাড়ানো যায়”

বাস্তবতা: Self-citation সম্পূর্ণভাবে বাদ দেওয়া হয়।

ভুল ধারণা ৩: “অনেক পেপার = ভালো র‍্যাঙ্কিং”

বাস্তবতা: মান, সাইটেশন এবং প্রভাব বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

ভুল ধারণা ৪: “নতুন গবেষক এতে স্থান পেতে পারে না”

বাস্তবতা: Single year impact তালিকায় নতুন গবেষকরাও উচ্চ-প্রভাবশালী কাজের জন্য স্থান পেতে পারেন।


টুলস এবং রিসোর্স

১. নিজের মেট্রিক্স চেক করুন

২. Stanford List চেক করুন

৩. প্রোফাইল ম্যানেজমেন্ট

  • ORCID: অনন্য গবেষক আইডি তৈরি করুন
  • Publons/Web of Science: পিয়ার রিভিউ ক্রেডিট পান

শীর্ষ ২% বিজ্ঞানীদের তালিকায় স্থান পাওয়া একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া যা মানসম্পন্ন, ধারাবাহিক এবং প্রভাবশালী গবেষণার ফলাফল। এটি শুধু সাইটেশন সংখ্যা নয়, বরং গবেষণার সামগ্রিক প্রভাব এবং অবদানের মূল্যায়ন।

বাংলাদেশী গবেষকদের জন্য এই লক্ষ্য অর্জনযোগ্য, যদি:

  • ✅ মানসম্পন্ন গবেষণায় ফোকাস করা হয়
  • ✅ আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো হয়
  • ✅ ধারাবাহিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া হয়
  • ✅ Strategic planning করা হয়

মনে রাখবেন: এটি একটি ম্যারাথন, স্প্রিন্ট নয়। ধৈর্য, পরিশ্রম এবং মানসম্পন্ন গবেষণাই সাফল্যের চাবিকাঠি।


অতিরিক্ত তথ্যঃ


সর্বশেষ আপডেট: জানুয়ারি ১৫, ২০২৬ ভাষা: বাংলা (বাংলাদেশ) লেখক: ScholarNote টিম


ScholarNote একাডেমিক গবেষকদের জন্য বিনামূল্যে টুলস এবং রিসোর্স প্রদান করে। নতুন টুলস এবং গাইডের জন্য আমাদের অনুসরণ করুন।

This post is licensed under CC BY 4.0 by the author.